মসজিদে সালাত স্থগিতঃ সৌদি ওলামাদের ফতোয়া

মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত এবং জুমার সালাত সাময়িকভাবে স্থগিত করা প্রসঙ্গে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ এর ফতোয়া।
তারিখ: ২২/৭/১৪৪১ হিজরি (১৭/৩/২০২০ খৃষ্টাব্দ)। সিদ্ধান্ত নং ২৪৭।
الحمد لله رب العالمين. والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد :
গত ২২/৭/১৪৪১ হিজরি (মোতাবেক ১৭/৩/২০২০ খৃষ্টাব্দ) মঙ্গলবার রিয়াদে সৌদি কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলারস (সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ) এর ২৫তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে তারা করোনা ভাইরাস, এর দ্রুত বিস্তার এবং ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি পর্যালোচনা করেন। পাশাপাশি তারা এই মহামারী সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য মেডিকেল রিপোর্টও খতিয়ে দেখেন।
সৌদি আরবের স্বাস্থ্যমন্ত্রী উক্ত অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে মহামারীর দ্রুত সংক্রমণ ও ভয়াবহতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এটি মানুষের জীবনের জন্য বিরাট হুমকি। সুতরাং এ বিষয়ে ব্যাপক সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে, এই ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, গণ জমায়েত সংক্রমণের প্রধান কারণ।
অধিবেশনে সিনিয়র স্কলারগণ মানুষের জীবন রক্ষার অপরিহার্যতা সংক্রান্ত কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করেন। যেমন:
❂ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَة
“এবং তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)
❂ তিনি আরও বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
“এবং নিজেদেরকে হত্যা করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।” (সূরা নিসা: ২৯)
এ দুটি আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জীবন নাশের কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য)।
এ ছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদিসগুলো দ্বারা মহামারি বিস্তৃতি লাভের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়। যেমন:
❂ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يُورِد ممرض على مصح- متفق عليه
“কোন ব্যক্তি যেন তার অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের কাছে না নিয়ে যায়।” (বুখারি ও মুসলিম)
❂ তিনি আরও বলেছেন,
فر من المجذوم كما تفر من الأسد -أخرجه البخاري
“কুষ্ঠরোগী থেকে সেভাবে পালাও যেভাবে সিংহ থেকে পলায়ন করো।” (সহিহ বুখারী)।
❂ তিনি আরও বলেন:
إذا سمعتم الطاعون بأرض فلا تدخلوها وإذا وقع بأرض وأنتم فيها فلا تخرجوا منها- متفق عليه.
“যদি কোন এলাকায় মহামারীর কথা শুনো তবে সেখানে যেও না। আর যদি কোন এলাকায় তোমাদের থাকা অবস্থায় মহামারী সৃষ্টি হয় তাহলে সেখান থেকে বের হয়ো না।” (বুখারি ও মুসলিম)
❂ আর শরিয়তের একটি একটি সু সাব্যস্ত মূলনীতি হল,
لا ضرر ولا ضرار
“নিজের অথবা অন্যের কোনও ক্ষতি করা যাবে না।”
❂ শরিয়তের আরেকটি মূলনীতি হল,
أن الضرر يدفع قدر الإمكان
“যতটা সম্ভব ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিহত করতে হবে।”
উপরোক্ত আলোচনার উপর ভিত্তি করে বলা যায়, (বিশেষ প্রয়োজনে) মসজিদে সকল ফরজ এবং জুমার সালাত বন্ধ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ। কেবল আজান দেয়াই যথেষ্ট। তবে হারামাইন তথা মক্কা ও মদিনার দু মসজিদ এর আওতামুক্ত থাকবে। মসজিদের দরজা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। এ সময় মসজিদগুলোতে আজান চালু থাকবে আর আজানে বলা হবে:
صلوا في بيوتكم
“সাল্লূ ফী বুয়ূতিকুম।”
“আপনার বাড়িতেই সালাত আদায় করুন।”
ইবনে আব্বাস রা. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুয়াজ্জিনকে আজানে এ কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
জুমার দিন বাড়িতেই জোহরের চার রাকআত সালাত আদায় করতে হবে।

আল্লাহর একটি অনুগ্রহ যে, ওজরের কারণে কেউ যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও জুমার সালাত জামাতে আদায় করতে সক্ষম না হয় তবুও তাঁকে তার পূর্ণ সওয়াব দান করা হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
إذا مرض العبد أو سافر كتب له مثل ما كان يعمل مقيماً صحيحاً
“বান্দা যদি অসুস্থ হয় অথবা সফরে যায় তাহলে সে সুস্থ ও আবাস অবস্থায় যে আমল করত মহান আল্লাহ তাকে তার সমপরিমাণ সওয়াব দান করেন।” (সহিহ বুখারি)
ওলামা পরিষদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জারি করা প্রতিরোধ ও সতর্কতামূলক নির্দেশনাগুলো পরিপূর্ণভাবে মেনে চলার এবং তাদেরকে সহযোগিতার করার জন্য সকলকে উপদেশ দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“এবং তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতির কাজে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কর না।” (সূরা মায়িদা: ২)
এ সকল পদক্ষেপ ও নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মেনে চলা মূলত: ‘সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতির কাজে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে আমাদের সুমহান দ্বীন আমাদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা করার পর ‘পার্থিব উপায়-উপকরণ অবলম্বন’ করার যে নির্দেশ দিয়েছে এটি তা বাস্তবায়নের শামিল।
পাশাপাশি আমরা সবাইকে আল্লাহকে ভয় করা, অধিকহারে আল্লাহর নিকট
ক্ষমা প্রার্থনা এবং বিনীত ভাবে দোয়া করার জন্য উপদেশ দিচ্ছি।
আল্লাহ বলেন:
وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ
“(হুদ আলাইহিস সালাম বললেন) হে আমার সম্প্রদায়, তোমারা তোমাদের পালনকর্তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর কাছে তওবা কর। তিনি তোমাদেরকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি দিবেন এবং তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন।” (সূরা হুদ: ৫২)
এখানে ‘শক্তি’ কথাটির মধ্যে জীবন-জীবিকার প্রাচুর্যতা, সার্বিক নিরাপত্তা এবং
সর্ব প্রকার সুস্থতা ও বিপদাপদ থেকে মুক্তির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
আমরা মহান আল্লাহর নিকট দুআ করি, তিনি যেন তাঁর বান্দাদের থেকে এ মহাবিপদ উঠিয়ে নেন এবং খাদেমুল হারামাইন শরীফাইন, ক্রাউন প্রিন্স এবং আমাদের বিচক্ষণ সরকারকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারীর প্রতিরোধে
গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ ও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় উত্তম বিনিময় দান করেন। আরও দুআ করি, তিনি যেন সকলকে হেফাজত করেন।
فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“কারণ আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ হেফাজত কারী ও সর্বাধিক দয়াশীল।” সূরা ইউসুফ: ৫৪)
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

➧ ফতোয়ার লিংক: http://bit.ly/2QqJ86q
➧ আরও পড়ুন: মহামারী রোগের সম্প্রসারণ ও তার আশঙ্কা জনক অবস্থায় জুমা ও জামাতে সালাতে অংশগ্রহণ বিষয়ক জরুরি ফতোয়া
http://bit.ly/2wlG9FA
অনুবাদক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

admin

Professional Graphic Designer

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: