দেশে জরুরী অবস্থা জারি নিয়ে দ্বিমুখী নীতিমালা!

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। এর মাঝে মৌসুমি জ্বর আর কাশির উপসর্গ মানুষকে আরও বেশি আতংকিত করছে। ফলে দাবি উঠেছে দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণার, কিংবা বিভিন্ন এলাকা ‘লোক ডাউন’ করে দেবার, গণ পরিবহণ চলাচল বন্ধ করে দেবার। কিন্তু কোন এলাকায় কী পরিমাণ মানুষ সত্যিকার অর্থে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি দেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট আর স্বাস্থ্য কর্মীদের যথেষ্ট পরিমাণ পিপিই না থাকার কারণে। দুই এক দিনের মধ্যেই কিট আর পিপিই চালান এসে গেলে পরীক্ষার পরে আসল সংখ্যা জানা যাবে।
আমরা জানি যে ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার শহর ঢাকা। জাতিসংঘের সর্বশেষ হ্যাবিটেট প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শহরে এখন প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৪ হাজার ৫০০ মানুষ বাস করে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে ইউএন হ্যাবিটেট। ঘনবসতির দিক দিয়ে এক নম্বর অবস্থানে আছে ঢাকা, ১৩৪ বর্গমাইল আয়তনের এই শহরে প্রতি বর্গমাইল এলাকায় ১ লক্ষ ১৫ হাজার লোকের বাস। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের মুম্বাই।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার সহ অনেক অফিস, কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই কারণে আদেশ বাতিল হওয়ায় কোটি কোটি ডলারের গার্মেন্টস রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে। চরম ঝুঁকি নিয়ে গার্মেন্টস শিল্প এখনো চালু রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। রাস্তায় গণ পরিবহণ এতই কমে গেছে যা সাধারণত ঈদের সময়ও দেখা যায় না।
আমরা জানি যে, ঢাকা শহর সহ সারা দেশে বহু মানুষ দিন হাজিরা বা দৈনিক আয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব মানুষের একটা বিরাট অংশ ইতোমধ্যে সমস্যার অকূল পাথারে পড়েছেন। কারণ গণ পরিবহনে মানুষের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে করোনাভাইরাসের ভয়ে। দৈনিক আয় করে সংসার চালান মানুষের কেউ রিক্সা, কেউ ঠেলাগাড়ি, কেউ ভ্যান চালিয়ে আবার অনেকে পরিবহনে দৈনিক হাজিরায় কাজ করেন, নসিমন, করিমন, ব্যাটারি চালিত অটো চালান। ঢাকা শহরের মত বড় শহরের রাস্তার পাশের হকার, নির্মাণ শ্রমিক, নগরীর গৃহস্থালি ময়লা সংগ্রহের শ্রমিক, ইত্যাদি নানা ধরণের শ্রমজীবীদের সেবায় ঢাকা তথা নগরীতে আয়েশি নগর জীবন কাটে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বা বিলস এর গবেষণার পর নিকট অতীতের এক রিপোর্টে বলছে শুধু ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ১১ লাখের মতো। দিনে একটি রিকশা দুই শিফটে চলে। এর চালকের সংখ্যা সেই হিসেবে আনুমানিক ২২ লাখের মতো। এছাড়া ২০১৭ সালের এক জরীপে দেখা যায় ঢাকা শহরের ফুটপাতে হকারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার, বাস্তবে আরও বেশি। অন্যদিকে নৌ-পরিবহণ শ্রমিক বাদ দিলেও সরকারী পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ হিসেব মত ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেশে তালিকাভুক্ত পরিবহনের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখের বেশি। শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সম্প্রতি বলেছে, পোশাকশিল্পে ২১ লাখ ৩০ হাজার ১৫৪ শ্রমিক কাজ করেন।
সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও আনুমানিক হিসেবে দেশে নসিমন, করিমন, ব্যাটারি চালিত অটো চালক, গৃহস্থালি ময়লা সংগ্রাহক, নির্মাণ শ্রমিক ইত্যাদি মিলে কম করে হলেও ৫০ লাখ পরিবারের অর্থ আর অন্ন সংস্থান হয় দৈনিক হাজিরার কাজে। মানে দাঁড়ালো ৫০ গুন ৫ সমান প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জীবন জীবিকা হুমকির মুখে চলে যাবে সারা দেশে লক ডাউন বা কারফিউ দিলে। এরা না খেয়ে মরার দশা হবে। উন্নত দেশে মানুষ তাঁদের মোট আয়ের ২৫ শতাংশ সঞ্চয় করে আপদকালীন সময়ের জন্য বা অবসর কালীন সময়ের জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় ভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সবার জন্য নেই, আছে সীমিত। এমতাবস্থায়, এলাকা ভিত্তিক না করে সরকার সারা দেশ লোক ডাউন বা কিংবা জরুরী অবস্থা জারি করতে পারবেন না।

admin

Professional Graphic Designer

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: