ঢাকা ছাড়ার হিড়িকে ঝুঁকি বাড়ল!

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার অন্যান্য ছুটির সঙ্গে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। আরো বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ ঘরে থেকে নিরাপদে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। কোনো অবস্থাতেই মানুষ যাতে অন্য ছুটির সময়কার সঙ্গে এই পরিস্থিতিকে মিলিয়ে না ফেলে। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকা ছাড়তে বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে মানুষের যে ভিড় দেখা গেছে সেটা হতাশাজনক। মানুষের এভাবে ঢাকা ছাড়ার হিড়িক দেখে বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, এতে করে করোনাভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরো বেড়ে গেল।
বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি ও হতাশার মধ্যেও করোনাভাইরাস পরিস্থিতি দ্রুত সামলে নেওয়ার নতুন কৌশল অবলম্বন করে কাজ শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে গত তিন-চার দিন আগে থেকেই বেড়ে গেছে নানা ধরনের প্রস্তুতি। আগের ঘাটতিগুলো কাটানোর জন্য একের পর এক আপৎকালীন কঠিন সিদ্ধান্ত দেওয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গত সোমবার সরকার ১০ দফা নির্দেশনা দিয়ে যে কাজ শুরু করেছে তা করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আশানুরূপ ফল দেবে বলে মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর এক দিন আগে থেকেই যেসব ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে নানা কৌশলে প্রবাসীরা দেশে ফিরছিলেন তার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আকাশপথ বন্ধের পাশাপাশি দুই দিন আগে সব স্থলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এক কথায় দেশের বাইরে থেকে এখন আর কেউ দেশে প্রবেশের কোনো পথ নেই। এ পদক্ষেপটি আরো আগে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সেই সঙ্গে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কোয়ারেন্টিনের পরিধি বাড়ানোরও তাগিদ ছিল বিভিন্ন পর্যায় থেকে। আগে থেকেই সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে গতকাল থেকে। মানুষকে ঘরে রাখতে সহায়তায় মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। কাল থেকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত। কেবল মানুষের জরুরি প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোনো কিছুই খোলা থাকবে না। ৪ এপ্রিল পর্যন্ত এ ছুটির সময় মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন ঘর থেকে বের না হয় সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে আগের চেয়েও অধিকতর সতর্কতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘লকডাউন’ একমাত্র সমাধান নয়। এর সঙ্গে সতর্কতা, পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থাপনাও চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেকের কাছে দেরি মনে হলেও সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন দেশের নাগরিক হিসেবে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব পালন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার যত কঠোর হোক নাগরিকরা যদি নিজের নিরাপত্তা ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিজে না নেয়, ঘরে না থেকে বাইরে ঘোরাফেরা করে তবে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাবে। সরকার যতই কঠোর পদক্ষেপ নিক, নাগরিকদের দায়িত্ব রয়েছে সরকারকে সহায়তা করা। সবার মধ্যে এখন এই চেতনা জাগ্রত করতে হবে। নয়তো উল্টো সারা দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, সব কিছু বন্ধ করা হলো করোনাভাইরাস যাতে ছড়াতে না পারে সে জন্য। কিন্তু মানুষ এতই অসতর্ক যে তারা সব কিছু জেনে বুঝেও ঈদের সময়ের মতো বাড়ি যাওয়ার জন্য স্টেশনগুলোতে জমায়েত হচ্ছে। এটা তো আরো বড় বিপদ বয়ে আনতে পারে সারা দেশে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখন যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকতে হবে। নতুনবা নিজেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিপদে পড়বেন। আবার পরিবার ও সমাজের অন্যদের মধ্যেও এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে তাদেরকেও বিপদে ফেলবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ২১ জানুয়ারি থেকে প্রায় সাত লাখ মানুষ দেশে ঢুকেছে। যাদের অনেকের মাধ্যমে করোনাভাইরাস দেশে আমদানি হয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে সেটা কতটা ছড়িয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দেশের বাইরে থেকে আসার তুলনায় আরো অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ গত কয়েক দিনে ঢাকা ছেড়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এটা আরো বড় ঝুঁকির বিষয় হয়ে উঠেছে। এখন কেবল বিদেশফেরত নয়, ঢাকাফেরত মানুষদের দিকেও একইভাবে নজর রাখতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পর্যায়ের ব্যক্তিদের। এর ফলে মাঠপর্যায়ে কাজ আরো কঠিন হয়ে উঠল।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, গত ২৩ দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা আরো জোরদার করা হয়েছে। নতুন আরো বেশ কিছু আইসোলেশন ইউনিট ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণ পাঠানো হয়েছে কয়েক হাজার। বিদেশ থেকে আজকালের মধ্যেই এসে পৌঁছবে কয়েক লাখ নিরাপত্তা ও পরীক্ষা উপকরণ। এ ক্ষেত্রে যেসব মানুষ মাঠপর্যায়ে নিজেদের করোনা আক্রান্ত বলে সন্দেহ করবেন তাঁরা প্রথমত স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হবেন এবং প্রয়োজন হলে কাছাকাছি পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করাতে পারবেন। সে লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে দ্রুত আটটি পরীক্ষাকেন্দ্র চালুর প্রক্রিয়া চলছে।

তথ্যসূত্রঃঃ কালের কণ্ঠ

admin

Professional Graphic Designer

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: